ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে বড়জোর তিন কিলোমিটার দূরত্বে সীতাকুন্ডের সোনাইছড়ি ত্রিপুরা পাড়া। অজ্ঞাত রোগে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় ২০১৭ সালের জু্‌লাইয়ে গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে উঠেছিল পাড়াটি। যদিও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ‘অজ্ঞাত’ রোগটি হাম হিসেবে শনাক্ত করতে সমর্থ হয় স্বাস্থ্য প্রশাসন।

ত্রিপুরা পল্লীটিতে ৬০টিরও বেশি পরিবারের বসবাস। কিন্তু গণমাধ্যমের শিরোনাম হওয়ার আগ (২০১৭ সাল) পর্যন্ত চিকিৎসা কিংবা শিক্ষার সুবিধা থেকে এক প্রকার বঞ্চিতই ছিল এ পাড়ার বাসিন্দারা। গণমাধ্যমের বরাতে সরকারের নজরে আসার পরই একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয় পাড়ায়। ২০১৭ সালের শেষ দিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি স্থাপন করা হলেও স্কুলটির পাঠদান কার্যক্রম চালু হয় ২০১৮ সালে। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ প্রকল্পের আওতায় স্থাপন করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির নাম সোনাইছড়ি ত্রিপুরা পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়। শুরুতে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তির মাধ্যমে পাঠদান শুরু করা হলেও এবছর (২০২০ সাল) থেকে প্রথম শ্রেণির পাঠদান চালু করা হয়েছে স্কুলটিতে।
সীতাকুন্ড উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য বলছে- ২০১৯ সালে প্রাক-প্রাথমিকে ৬৭ জন শিক্ষার্থী ছিল এ স্কুলে। এসব শিক্ষার্থী দিয়েই এবছর প্রথম শ্রেণির কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে এবার নতুন ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ৬০ জনের কম নয়। সবমিলিয়ে স্কুলটির বর্তমান শিক্ষার্থীর সংখ্যা শতাধিক। সব শিক্ষার্থী-ই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ত্রিপুরা সমপ্রদায়ের। এদিকে, সরকারি বিশেষ উদ্যোগের আওতায় বছরের প্রথম দিন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর এসব শিক্ষার্থীর হাতে-হাতে তুলে দেয়া হয়েছে মাতৃভাষায় (ত্রিপুরা ভাষায়) রচিত পাঠ্য বই।
কিন্তু ২ জন বাঙালি শিক্ষক থাকলেও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কোন শিক্ষক নেই স্কুলটিতে। ফলে মাতৃভাষায় বই পেলেও সেই বই পড়ার সুযোগ পাচ্ছে না এসব শিক্ষার্থী। এতথ্য নিশ্চিত করে সীতাকুন্ড উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ নুরুচ্ছফা বলেছেন, এটিসহ উপজেলার মোট ৩টি স্কুলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা অধ্যয়ন করছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে ত্রিপুরা সমপ্রদায়ের শিক্ষার্থী-ই বেশি। তবে অল্প কিছু সংখ্যক চাকমা সমপ্রদায়ের শিক্ষার্থীও রয়েছে। কিন্তু এসব স্কুলে ত্রিপুরা ও চাকমা সমপ্রদায়ের (ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর) একজন শিক্ষকও নেই। শিক্ষক না থাকায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষায় রচিত এসব বই স্কুলে পড়ানো যাচ্ছে না বলেও জানান উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ নুরুচ্ছফা। একই চিত্র মিরসরাই উপজেলার খোকন ত্রিপুরা পাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ২ শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে স্কুলটিতে। উপজেলার মোট ৮টি স্কুলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রায় ৫’শ শিক্ষার্থী থাকলেও স্কুলগুলোতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর একজন শিক্ষকও নেই বলে নিশ্চিত করেছেন মিরসরাই উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম রহমান চৌধুরী।
এই দুটিসহ চট্টগ্রাম জেলার চারটি উপজেলা/থানার মোট ২০টি স্কুলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা অধ্যয়ন করছে। এর মধ্যে নগরের পাঁচলাইশ থানাধীন ২টি, মিরসরাই উপজেলায় ৮টি, রাঙ্গুনীয়ায় ৭টি এবং সীতাকুন্ড উপজেলার ৩টি স্কুলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থী রয়েছে বলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী- জেলার এই ২০টি স্কুলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মোট ৮৬৩ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এদের মধ্যে বিশেষ করে মারমা, চাকমা ও ত্রিপুরা সমপ্রদায়ের শিক্ষার্থীরাই অধ্যয়ন করছে স্কুলগুলোতে। বছরের প্রথম দিন এসব শিক্ষার্থীর হাতে তাদের মাতৃভাষায় রচিত ২ হাজার ৯০টি বই তুলে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের একটি করে, ১ম ও ২য় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ৩টি করে এবং ৩য় শ্রেনির শিক্ষার্থীদের একটি করে (বাংলা) বই (মাতৃভাষায় রচিত) দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের মনিটরিং কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ।
নগরীর পাঁচলাইশ থানা এলাকায় দুটি স্কুলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মারমা, চাকমা ও ত্রিপুরা সমপ্রদায়ের শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে বলে জানিয়েছেন থানা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মু. আবদুল হামিদ। দুটি স্কুল হচ্ছে- হামজারবাগ এলাকার আলহাজ্ব এম নাজের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপপাতাল মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই দুই স্কুলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থী থাকলেও শিক্ষক নেই বলে নিশ্চিত করেন এই শিক্ষা কর্মকর্তা। অবশ্য, রাঙ্গুনিয়ার স্কুলগুলোতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ৭জন শিক্ষক রয়েছেন বলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্র জানিয়েছে। উপজেলার ৭টি স্কুলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রায় দুইশ শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত আছে বলেও জানান উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) মো. জহির উদ্দিন।
শিক্ষক ও উপজেলা/থানা শিক্ষা কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষায় রচিত পাঠ্য বই শিক্ষার্থীদের হাতে দেয়া হলেও এসব বইয়ের উপর কোন পরীক্ষা নেয়া হয় না। পরীক্ষা না থাকায় প্রশ্নপত্র প্রণয়নও হয় না। আর পড়া বলতে মূলত বাসায়। বাসায় অভিভাবকরা নিজেরা ম্যানেজ করে সন্তানদের মাতৃভাষায় রচিত এই বই পড়ানোর ব্যবস্থা করে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে স্কুলে এসব বইয়ের উপর কোন ধরনের কার্যক্রম বা পাঠদান নেই বললেই চলে। পাঁচলাইশ থানা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাসহ অন্যান্য কর্মকর্তারাও বিষয়টি অস্বীকার করেননি।
শিক্ষক না থাকায় এসব বই কে পড়াবে, এমন প্রশ্নে নিজেই চিন্তায় পড়েছেন বলে জানান চট্টগ্রামের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম। তিনি আজাদীকে বলেন, এটি আসলেই ভাববার বিষয়। আমরা শিক্ষার্থীদের হাতে তাদের মাতৃ ভাষার বই তুলে দিলাম। কিন্তু এসব বই পড়ানোর শিক্ষক তো নেই। বিষয়টি উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।
এব্যাপারে বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. সুলতান মিয়া বলেন, পার্বত্য জেলাগুলোতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর যথেষ্ট শিক্ষক আছেন। এসব বই (ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষার) পড়ানোর জন্য তাদের প্রশিক্ষণও দেয়া হয়। তাই পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে তেমন একটা সমস্যা নেই। কিন্তু সমতলে (চট্টগ্রামসহ আরো কয়েকটি জেলায়) শিক্ষার্থী থাকলেও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষক নেই বললেই চলে। এ সমস্যা সমাধানে আলাদা নীতিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব পাঠানোর কথা জানিয়ে উপ-পরিচালক বলেন, এটির জন্য আলাদা নীতিমালা প্রয়োজন হতে পারে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে আমরা আলাদা প্রস্তাব পাঠাবো।
উপ-পরিচালক বলেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষক রয়েছে এমন উপজেলা থেকে হয়তো আমরা কিছুদিনের জন্য অদল-বদল করে শিক্ষক নিয়ে আসলাম। কিন্তু যে শিক্ষককে আনা হবে তিনি রাজি নাও থাকতে পারেন। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা বা পারিবারিক সমস্যার কারণে তিনি বদলি হিসেবে অন্য জায়গায় যেতে আগ্রহ নাও দেখাতে পারেন। তাই এক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। যার কারণে মন্ত্রণালয় আলাদা নীতিমালা করে দিলে এক্ষেত্রে আর সমস্যা থাকবে না।